
কক্সবাজারের সীমান্তবর্তী জনপদ টেকনাফে দিন দিন বেড়েই চলেছে অপরাধপ্রবণতা। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হিসেবে জেঁকে বসেছে সর্বগ্রাসী মাদক ব্যবসা। কঠোর আইন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন অভিযানের পরও টেকনাফের মাদক সিন্ডিকেট যেন কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সীমান্ত এলাকার ভৌগোলিক অবস্থান এবং বহুমুখী অপরাধচক্রের তৎপরতার কারণে এই জনপদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আজ বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। টেকনাফের প্রধান অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত মাদক চোরাচালানের মূল কারণ এর সীমান্তবর্তী অবস্থান। স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি এই অঞ্চলে প্রচুর রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, স্থানীয় মূলহোতারা মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করলেও নাফ নদী পারাপার ও বহনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। জেলেদের ছদ্মবেশে নাফ নদী থেকে মাদক তুলে এনে বেনামী ও অভিনব কায়দায় বিভিন্ন যানবাহনে করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সারা দেশে।
মাদক চোরাচালানের বিশাল এই রুট নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন রয়েছে—প্রতিদিন যে পরিমাণ মাদক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ে, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি কীভাবে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে?
মাদক কারবারিদের একাংশের দাবি, সীমান্ত সুরক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশ এবং প্রশাসনিক নজরদারির ফাঁকফোকর গলিয়ে নির্বিঘ্নে আসছে এসব চালান। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে, তবুও চক্রের মূলহোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বহনকারীরা ধরা পড়লেও মূল কারবারিদের নাম প্রকাশ না করে সমস্ত দায় নিজেদের কাঁধে তুলে নেয়।
মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্যে টেকনাফের সামাজিক ভারসাম্য আজ মারাত্মকভাবে নষ্ট হচ্ছে। অল্প সময়ে অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ায় তাদের জীবনযাত্রা অত্যন্ত বিলাসবহুল। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম সাধারণ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার পেছনে এই সিন্ডিকেটগুলোর সিন্ডিকেটভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ অনেকাংশে দায়ী। তাদের সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের বিলাসবহুল জীবনযাপন সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি করছে। মাদকের এই বিষাক্ত ছোবল থেকে একটি পরিবার, সমাজ তথা পুরো রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞদের মতে, নিমোক্ত পদক্ষেপগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করা যেতে পারলে হয়তোবা বিশাল এই সমস্যার নিরসন সম্ভব:
প্রশাসনিক রদবদল ও সেনা মোতায়েন: সীমান্ত পাহারায় নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্মীদের নিয়মিত বদলির পাশাপাশি সীমান্তে কঠোর নজরদারির জন্য যৌথ বাহিনী বা সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া।
সম্পদের হিসাব ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি: মাদক কারবারিদের অবৈধ আয়ের হিসাব নেওয়া এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা জোরদার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান করা।
সামাজিক ও রাজনৈতিক বয়কট: মাদক ব্যবসায়ীদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সকল কমিটি থেকে বহিষ্কার এবং সামাজিকভাবে বয়কট করা। রাজনীতিতে তাদের প্রভাব কমিয়ে শিক্ষিত ও হালাল উপার্জনকারীদের নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা।
আইনি কড়াকড়ি ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত: মাদক ব্যবসায়ীদের অর্জিত অবৈধ সম্পদ আইনি প্রক্রিয়ায় ক্রোক করা এবং নির্বাচনে কালো টাকার ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা।
নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষা: সমাজে নৈতিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং প্রতিটি ধর্মীয় উপাসনালয়ে মাদকের কুফল ও পরকালের ভয়াবহতা নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করা।
পুনর্বাসন ও যুবসমাজকে সম্পৃক্তকরণ: মাদকের সাথে জড়িত যারা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চায়, তাদের জন্য পুনর্বাসন ও দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচির ব্যবস্থা করা। পাশাপাশি যুবসমাজকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে খেলাধুলা ও গঠনমূলক কাজে সম্পৃক্ত করা।
মাদক একটি সমাজকে তিল তিল করে ধ্বংস করে দিচ্ছে। টেকনাফের এই সংকটময় পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণকে একযোগে কাজ করতে হবে। এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করার।
মন্তব্য করুন