
লোহাগাড়ায় প্রাইভেট মাদ্রাসার একজন শিক্ষক আ’ত্মহ’ত্যা করে মৃত্যু বরণ করেছে এটি খুবই দুঃখ জনক। উনি একজন কুরআনে হাফেজ এটা আরও বেশি মর্মান্তিক।
বলতে হয়- কুরআনে হাফেজ হোক বা বড় আল্লামা হোক, দিন শেষে তিনি একজন মানুষ। মানুষ হিসেবে আমরা কেউ ভুলের উর্ধ্বে নই। একজন কুরআনে হাফেজ কিন্তু ওনি আলেম নয়। অনেক কুরআনে হাফেজ দেখেছি যাদের কুরআনের ভাষাগত জ্ঞান বা দ্বীনের জ্ঞান নাই। তবে সমাজ তাদেরকে আলেম হিসাবে জানে। এ ধরনের আলেম বা হুজুরের মাধ্যমে দ্বীনের বিশাল ক্ষতি হয়। হয়তো এ ঘটনার কারণে এমন একটা ক্ষতি হলো।
★★এটা হত্যা নাকি আত্মহত্যা?
একজন আইনজীবী হিসেবে এটাকে নিয়ে সরাসরি মন্তব্য, তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই সরাসরি মন্তব্য করা হতে বিরত থাকলাম।
একইভাবে মাদ্রাসা কতৃপক্ষ অপরাধী, নাকি উনার স্ত্রী জড়িত। নাকি সে নিজেই আত্মহত্যা করেছে। সেটি নিয়েও মন্তব্য করাটা অনুচিত মনে করছি।
আমরা যারা কেউ স্ত্রীকে অপরাধী বানিয়েছি, আবার অনেকে মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদদের পক্ষে যিনি মিড়িয়াতে কথা বলেছেন ওনাকে অভিযুক্ত করেছি। আবার অনেকে হুজুরের অপকর্মের ফিরিস্তি তুলে আত্মহত্যার জন্য দায়ী করেছি।
মূলত আমরা সবাই আন্দাজে কথা বলেছি। যতটুকু জানি বা দেখেছি এর বাইরে গিয়ে আন্দাজ করে যারা কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহ বলেন-” ধ্বংস তাদের জন্য যারা আন্দাজে কথা বলে” (সূরা জারিয়াহ, আয়াত-০৪)
করো উপর অন্যায়ভাবে দোষ চাপিয়ে দেওয়া এটাও বড় জুলুম। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে জালেম হওয়া হতে হেফাজত করুন- আমিন।
কখন বুঝবেন এটি হত্যা-
একটি এ রকম আত্মহত্যায় পুলিশের কয়েকটি দায়িত্ব –
১) সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করা করা।
৩) জব্দ তালিকা তৈরি করা।
২) পোস্ট মর্টেম করা।
★★★ সুরহতাল রিপোর্ট –
ক) আত্ম হত্যার ঘটনার স্থানটি বিশেষভাবে সংরক্ষিত করা।
খ) আত্মহত্যাকরীর ঝুলিয়ে থাকার দৃশ্য ছবি, ভিডিও ক্লিপ সংরক্ষণ এবং লিখিতভাবে তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়ে লিপিবদ্ধ করা।
গ) গলায় রশি আটকানোর এঙ্গেল, আকৃতি, রশির ক্ষতের গভীরতা এগুলো নির্ণয় করা।
ঘ) আত্নহ’ত্যাকারীর জিহ্বা, চোখ, হাত ও পায়ের অবস্থা এবং যৌনাঙ্গের অবস্থা, শরীরের বিবরণ লিপি করতে হয়।
ঙ)পুরো শরীরের কোথাও আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা? তার সুস্পষ্ট ও সুক্ষভাবে বিবরণ লিপি বদ্ধ করবে।
ঘ) আত্মহ’ত্যাকারী কিসের উপর ভর করে আত্মহ’ত্যা করেছে তার একটি বিবরণ লিপি করবে।
চ) ঘটনার আশপাশে মানুষের হাত ও পায়ের চাপ সংরক্ষণ করবে।
জ) এগুলো একটি সাদা কাগজ বা নির্ধারিত ফর্মে নূন্যতম সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা লিপি করে তাতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর স্বাক্ষর গ্রহণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট অফিসার স্বাক্ষর করবে।
★★★ জব্দ তালিকা প্রস্তুত-
ক) ঘটনা সংশ্লিষ্ট সকল আলামত পুলিশের হেফাজতে নিবে।
খ) ঘটনার আশপাশের সিসি ক্যামরা ও সিডি পুলিশ হেফাজতে নিবেন।
গ) আত্মহ্যাকারীর মোবাইল, সন্দেহভাজনদের মোবাইল পুলিশ হেফাজতে নিবেন।
ঘ) আত্মহত্যাকারীর রশি/গামচা এবং কাপড় এগুলো পুলিশ হেফাজতে নিবেন
ঙ) এগুলো একটি সাদা কাগজ বা নির্ধারিত ফর্মে নূন্যতম সাব ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার একজন পুলিশ কর্মকর্তা লিপি করে তাতে উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর স্বাক্ষর গ্রহণ করবে এবং সংশ্লিষ্ট অফিসার স্বাক্ষর করবেন।
★★★ পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট –
ক) পোস্ট মর্টেম তৈরী করে সিভিল সার্জন। যাকে ময়না তদন্ত বলা হয়।
খ) পুলিশ সুরতহাল ও পোস্ট মর্টেম রিপোর্ট তৈরি করার জন্য লাশটি মর্গে প্রেরণ করবে।
গ) সিভিল সার্জন মৃত্যুর সময়, মৃত্যুর কারণ সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবেন।
ঘ) শরীরের প্রতিটি অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বিস্তারিত বিবরণ লিপি করবেন।
ঙ) হত্যা না আত্মহত্যা এর একটি সুস্পষ্ট মতামত দিবেন।
ঘ) তা একটি রেজিস্টারে লিপি করবে এবং স্বাক্ষর করবে।
# উপরের কার্যগুলো সম্পাদনের পর চিহ্নিত হবে এটি হত্যা না আত্মহত্যা।
– পুলিশ উপরোক্ত কাজগুলো করতে একটি ডায়েরি মেন্টেইন করবে। যার প্রতিটি পদক্ষেপ সেখানে লিপি থাকবে।
-অতঃপর পুলিশ একটি সাধারণ ডায়েরি করে আত্মহত্যাকারী পরিবারের কোন অভিযোগ না থাকলে এটিকে অপমৃত্যু মামলা হিসেবে লিপি করে রাখবে।
★★★ যদি এটি হত্যাকান্ড হয় কেউ মামলা না করলে পুলিশ নিজে বাদী হয়ে অজ্ঞাত আসামীর নাম দিয়ে একটি এজহার তৈরি করবে। এরপর পুলিশের বিশেষ টিম হত্যাকারীদের চিহ্নিত করতে এবং মামলার তদন্তে নেমে পড়েন।
★★★ যদি আত্মহত্যাকারীর পরিবারের কেউ বাদী হয়ে মামলা করেন। সেক্ষেত্রে পুলিশ চাইলে এটি হত্যা মামলা বা আত্মহত্যায় প্ররোচনাদানকারী মামলা হিসেবে দন্ডবিধি ১৮৬০ এর অধীনে ৩০২ ধারা বা ৩০৫ বা ৩০৬ ধারায় মামলা রুজু করতে পারেন।
★★★ নয়তো ভিকটিমের পরিবার আদালতের দ্বারস্থ হয়ে সি.আর হত্যা বা আত্মহ্যায় প্ররোচনা মামলা দায়ের করতে পারেন । আদালত এ মামলা গ্রহণ করে পুলিশকে বা যে কোন সংস্থাকে তদন্ত দিতে পারবেন। নয়তো এজহার হিসেবে গ্রহণ করে FIR গ্রহণের জন্য থানাকে নির্দেশ দিতে পারবেন।
★★ এবার চলুন উপরের আলোকে ঘটনা পর্যবেক্ষণ করি-
ঘটনাটি আমার গ্রামের বাড়ির খুবই কাছের স্থানে হওয়ায় সারাদিন এ ঘটনার বিভিন্ন সংবাদ, ওনার স্ত্রী ও মাদ্রাসা কমিটির বক্তব্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আপনাদের পোস্টগুলো এবং নিজে কল করে স্থানীয় প্রত্যক্ষ দর্শীদের বক্তব্য শুনেছি। ঘটনার বাস্তবতা অবলোকন করার চেষ্টা করেছি।
প্রত্যক্ষদার্শীর কাছ থেকে জানতে চেয়েছি-
১) আ’ত্মহ’ত্যাকারীর৷ শরীরে কোন আঘাতের চিহ্ন আছে কিনা?
উত্তর – কোন আঘাতের চিহ্ন বা ফোলা-যখম দেখিনি।
২) তিনি কিসের উপর দাঁড়িয়ে আত্মহত্যা করেছে?
উত্তর – আশপাশে তেমন কোন চেয়ার বা মোড়া দেখিনি। তবে একটি কার্টন দেখেছি।
৩) কার্টনটা কিসের ছিলো?
উত্তর – এটা ঢালের ছিলো। একজন শক্ত মানুষ এটাতে দাঁড়ানো কিভাবে সম্ভব!
৪) উনার স্ত্রী দেখতে কেমন?
উত্তর – ওনি এতোটাই হালকা-পাতলা যে ওনার স্বামীকে নিয়ে মেরে লটকাই দিবে। এটা কিভাবে সম্ভব! (সুরতহাল ও পোস্টমর্টেমে বলতে পারবে অন্ডকোষের কোন আঘাত আছে কিনা? ফোলা আছে কিনা?)
৫) রাতে মাদ্রাসায় আর কেউ ছিলো কিনা?
উত্তর- রাত ১২ টা পর্যন্ত মাদ্রাসার একজন ব্যক্তি পাশের রুমে ছিলো। তখনোও আত্মহত্যা’কারী ও ওনার স্ত্রী ঘুমাইনি।
৬) আশপাশে সিসি ক্যামেরা আছে কিনা?
উত্তর – জি সিসি ক্যামেরা আছে।
৭) যেখানে আত্নহত্যা হয়েছে ঐ রুমে সিসি ক্যামেরা আছে কিনা?
উত্তর- ঐ রুমে সিসি ক্যামেরা নাই। তবে আশপাশে সিসি ক্যামেরা আছে।
৮) ফ্যানের সাথে না ঝুলিয়ে ওয়ালের সাথে কিভাবে ঝুলতে পারলো?
উত্তর – এটা চিন্তা করছি।
সর্বোপরি – পুরোঘটানাটি সন্দেহে ঘেরা। এমতাবস্থায় পুলিশ চাইলে ৭২ ঘটনার মধ্যে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করতে পারবে।
এবার চলুন –
মাদ্রাসা কতৃপক্ষের দায়-
-অর্থ আত্মসাৎ ও জুয়া খেলায় টাকা অপচয় মাদ্রাসা কতৃপক্ষ কতৃক হিসাব গ্রহণ এটিকে অন্যায় কিছু দেখছিনা। আইনগতভাবে কতৃপক্ষ তাদের হিসাব নিতেই পারেন। এ অধিকার তাদের আছে। তবে কতৃপক্ষ একে কোন ধরনের শারীরিক টর্চার করছে কিনা? সেটি তদন্তের বিষয়। ঘটনায় কেউ জড়িত কিনা সেটা তদন্তের বিষয়।
-স্ত্রী’র দায়
স্ত্রী ঘটনাস্থলা থেকে পালিয়ে যাননি। সেটা পজিটিভ। ওনি যেভাবে খোলাখুলি মিডিয়াতে কথা বলেছেন সেটাও পজিটিভ। পেশাদার খু’নি না হলে। এভাবে সাধারণ কোন মানুষ খু’ন করার পর স্বভাবিক থাকতে পারবেনা।
সাধারণত আমার আইন অঙ্গনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি- স্ত্রী কতৃক হ’ত্যা হলে। অবশ্যই অন্ডকোষে আঘাতের চিহ্ন থাকবে।
-ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন –
১) সিসি ক্যামেরা এবং ঘটনার আগে পরে আশাপাশের চিত্র ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে সহযোগিতা করবে।
২) গলায় আঘাতের ধরন দেখে একজন ইনভেস্টিগেশন অফিসার বলতে পারবেন এটি হ’ত্যা নাকি আত্মহ’ত্যা।
৩) পোস্ট মর্টেম রিপোর্টে ডাক্তার বলতে পারবে এটি হ’ত্যা কী আত্মহ’ত্যা।
আইনগত মতামত –
১) একজন সুস্থ মস্তিষ্কের পুরুষ আত্মহ’ত্যা করলে অন্যের উপর দায় চাপানোর সুযোগ নেই। তবুও সর্বোচ্চ আত্মহত্যার প্ররোচনায় মামলা করলে আসামিরা আইনে খুব সহজে জামিন পাবে।
২) হত্যা’র আলামত পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আইনের হেফাজতে আনা জরুরি। এক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত আসামীরা হাজতে থাকবে। এটাই বাস্তবতা।
সর্বপরি, এরকম অপমৃ’ত্যু হতে মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন – আমিন।
লেখক – আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী।
মন্তব্য করুন