ABN BANGLA TV
৪ নভেম্বর ২০২৬, ৯:১৫ অপরাহ্ণ
অনলাইন সংস্করণ

রিফাইনারির অনুমোদন নেই, বিপিসির কাছে ১২ লাখ টন ক্রুড চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল

রিফাইনারির অনুমোদন নেই, বিপিসির কাছে ১২ লাখ টন ক্রুড চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল

নিউজ ডেস্ক

সরকারি অনুমোদন না পেয়েও অপরিশোধিত তেল পরিশোধনাগার নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি। এবার নির্মাণাধীন ওই প্ল্যান্টে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কাছে আবেদন করেছে প্রতিষ্ঠানটি। তাদের প্রস্তাবে ২০২৭ সালের জন্য চার লাখ টন লাইট ক্রুড এবং আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমোদন চাওয়া হয়েছে। তবে প্ল্যান্টটির নির্মাণ ও পরিচালনার সরকারি অনুমোদন না থাকায় এ উদ্যোগ নিয়ে জ্বালানি খাতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, যথাযথ সরকারি অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বিদ্যমান নীতিমালার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এদিকে রাষ্ট্রীয় একমাত্র তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারির সম্প্রসারণ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপিসি যখন উদ্যোগী হয়েছে, তখন অনুমোদনহীন বেসরকারি প্ল্যান্টের নির্মাণকাজ চলতে থাকলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।

 

গত ২৭ অক্টোবর বিপিসির চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার ২০২৭ সালের জন্য চার লাখ টন লাইট ক্রুড ও আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানির অনুমতি চান। তবে এর আগে গত ১৪ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের নির্মাণাধীন প্ল্যান্টে লাইট ক্রুড পরিশোধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।

 

২৭ অক্টোবরের চিঠি এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ক্রুড আমদানির অনুমতি চাওয়ার ক্ষেত্রে কনডেনসেট ও লাইট ক্রুডের বিষয়টি একইভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। চিঠিতে বিপিসির ১০ আগস্টের একটি পত্রের সূত্র উল্লেখ করে বলা হয়, ২০২৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি বিপিসিকে ২ লাখ ৫৬ হাজার ৫০০ টন অকটেন, ১ লাখ ১৯ হাজার টন পেট্রোল, ৪ লাখ ৬৬ হাজার ৫০০ টন ডিজেল এবং ৩ লাখ ৬১ হাজার টন হাই সালফার ফার্নেস অয়েল (এইচএফও) সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে।

 

এ পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে চার লাখ টন লাইট ক্রুড (কনডেনসেট) এবং আট লাখ টন হেভি ক্রুড আমদানি প্রয়োজন বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়। আমদানি করা কাঁচামাল পরিশোধনের মাধ্যমে উৎপাদিত জ্বালানি বিপিসিকে সরবরাহের কথাও জানানো হয়।

 

কিন্তু ১৪ জুলাই জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল। সেখানে বলা হয়, দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল পরিশোধনক্ষমতার প্ল্যান্টটি লাইট ক্রুড পরিশোধনের উপযোগী করে নির্মাণ করা হচ্ছে। এ জন্য বছরে ২০ লাখ টন সৌদি আরবের অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড অথবা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মারবান ক্রুড আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।

 

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট বর্তমান এবং সাবেক কর্মকর্তাদের মতে, কনডেনসেট ও লাইট ক্রুডের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। দুটিকে সরাসরি একই পণ্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। বিপিসির আগের বিভিন্ন অনুমতিপত্রেও কনডেনসেটকে লাইট ক্রুড হিসেবে উল্লেখ করার নজির পাওয়া যায়নি।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইস্টার্ন রিফাইনারির সাবেক এক মহাব্যবস্থাপক বলেন, কনডেনসেটকে সাধারণভাবে লাইট ক্রুড অয়েল হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়। কনডেনসেট মূলত গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া গ্যাসের উপজাত। অন্যদিকে ক্রুড অয়েল আসে তেলক্ষেত্র থেকে। এ দুটি কাঁচামালের বৈশিষ্ট্য ও উৎস আলাদা।

 

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরীও বিষয়টিতে পার্থক্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কনডেনসেট এক ধরনের হালকা হাইড্রোকার্বন হলেও ইস্টার্ন রিফাইনারিতে পরিশোধনের জন্য আমদানি করা লাইট ক্রুডের সঙ্গে একে এক করে দেখার সুযোগ নেই। কনডেনসেট গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসে, আর লাইট ক্রুড তেলক্ষেত্র থেকে উত্তোলন করা হয়। উভয় কাঁচামাল পরিশোধন করে পেট্রোলিয়ামজাত জ্বালানি উৎপাদন করা সম্ভব।

 

এদিকে গত ১৪ জুলাই মন্ত্রীকে পাঠানো চিঠিতে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল তাদের দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড অয়েল রিফাইনারি প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের সহযোগিতা চায়। সেখানে প্রকল্পটির বার্ষিক পরিশোধনক্ষমতা সাড়ে ১৭ লাখ মেট্রিক টন উল্লেখ করে লাইট ক্রুড পরিশোধনের পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। তবে ওই চিঠিতে প্রকল্পটির সরকারি অনুমোদন না পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।

 

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, বিপিসির মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন স্বাক্ষরিত গত ১০ আগস্টের চিঠিতে ২০২৭ সালের জন্য সুপার পেট্রোকেমিক্যালের কাছ থেকে সম্ভাব্য জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ জানতে চাওয়া হয়। বিপিসির আমদানি পরিকল্পনা তৈরির স্বার্থে প্রতিষ্ঠানটির অকটেন, পেট্রোল, ডিজেলসহ বিভিন্ন গ্রেডের জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণ জরুরি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

 

এ জন্য ২০২৬ সালের ৩০ জুলাইয়ের মধ্যে তথ্য পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পাওয়ায় ১২ আগস্টের মধ্যে ২০২৭ সালের জানুয়ারি-জুন এবং জুলাই-ডিসেম্বর সময়ের মাসভিত্তিক ও গ্রেডভিত্তিক সরবরাহের পরিমাণ ছক অনুযায়ী পাঠাতে বলা হয়।

 

এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২ আগস্ট সুপার পেট্রোকেমিক্যালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণব কুমার সাহা স্বাক্ষরিত চিঠিতে ২০২৭ সালে বিপিসিকে মোট ১২ লাখ ৩ হাজার টন পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহের পরিকল্পনা জানানো হয়।

 

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি ছাড়া বছরের বাকি ১১ মাসে প্রতি মাসে ২১ হাজার ৫০০ টন অকটেন এবং ১০ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহের কথা বলা হয়। একইভাবে মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসে ৫০ হাজার টন ডিজেল এবং ৪২ হাজার টন এইচএফও সরবরাহের পরিকল্পনা জানানো হয়।

 

এ ছাড়া ফেব্রুয়ারিতে ২০ হাজার টন অকটেন ও ৯ হাজার টন পেট্রোল সরবরাহের কথা উল্লেখ করা হয়। ডিজেলের ক্ষেত্রে জানুয়ারিতে ১২ হাজার ৫০০ টন, ফেব্রুয়ারিতে ১১ হাজার ৫০০ টন, মার্চে ১২ হাজার ৫০০ টন এবং এপ্রিলে ৩০ হাজার টন সরবরাহের পরিকল্পনা দেওয়া হয়। পাশাপাশি এইচএফও সরবরাহের পরিকল্পনাও চিঠিতে তুলে ধরা হয়।

 

চিঠির তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়, বর্তমানে নির্মাণাধীন দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ক্ষমতার ক্রুড ডিস্টিলেশন ইউনিট (সিডিইউ) ২০২৭ সালের মার্চে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। এ পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়ে এপ্রিল থেকে জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে।

 

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রণব কুমার সাহার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।

 

বিপিসির চেয়ারম্যান ড. রফিকুল ইসলাম বলেন, সুপার পেট্রোকেমিক্যালের ক্রুড আমদানির অনুমতি চেয়ে পাঠানো একটি চিঠি তাঁর কাছে এসেছে। বিষয়টি বিপিসির সংশ্লিষ্ট দল পর্যালোচনা করছে। তবে সরকারি অনুমোদন ছাড়া স্পর্শকাতর জ্বালানি খাতে রিফাইনারি প্ল্যান্ট নির্মাণের সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

 

কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম বলেন, জ্বালানি বিশ্বব্যাপী একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর পণ্য। বাংলাদেশে সরকারি অনুমোদন ছাড়া কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের রিফাইনারি নির্মাণ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমোদন না নিয়ে এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণ আইন লঙ্ঘনের শামিল। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় এনে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

 

উল্লেখ্য, সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি বর্তমানে তাদের ফ্রাকশনেশন প্ল্যান্ট থেকে উৎপাদিত অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেলসহ বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্য বিপিসিকে সরবরাহ করে। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি অকটেন, পেট্রোল, ডিজেল, এমটিটি, লাইট এমএস ও এসবিপিএস মিলিয়ে মোট ২ লাখ ৫৬ হাজার ৩৭ টন পেট্রোলিয়াম পণ্য সরবরাহ করেছে।

 

এসব পণ্য উৎপাদনের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বিপিসির পূর্বানুমোদন নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারি থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ন্যাফতা, পেট্রোবাংলা থেকে দেশীয় কনডেনসেট এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা কনডেনসেট ব্যবহার করে থাকে।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

রিফাইনারির অনুমোদন নেই, বিপিসির কাছে ১২ লাখ টন ক্রুড চায় সুপার পেট্রোকেমিক্যাল

১

বান্দরবান জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের মাসিক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত

২

এপেক্স ক্লাব অব বার-আউলিয়ার সভাপতি আফজাল হোসাইন ফারাবী ও সাধারন সম্পাদক শহীদুল ইসলাম সুমন নির্বাচিত

৩

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্নমত দমনের অভিযোগ, বাংলাদেশের প্রতি এইচআরডব্লিউর সতর্কবার্তা

৪

বান্দরবানের অদম্য ইমতিয়াজ: দৃষ্টিপ্রতিবন্ধকতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এইচএসসিতে সাফল্য

৫

ইটভাটা বন্ধ বান্দরবানে, উন্নয়ন ব্যাহত; ইট কিনতে বাড়তি টাকা গুনছেন বান্দরবানবাসী।

৬

বিশ্ববিদ্যালয় ফুটবলে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা নিয়ে শেষ হলো এবিজি ইউনিভার্সিটি কাপ

৭

১০০ কিলোমিটার দূরে রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম, লামাবাসীর তীব্র ক্ষোভ: দুই লাখ মানুুষের দুর্ভোগের আশঙ্কা, সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি

৮

বাইন্যান্সে সাইবার ডাকাতি, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত

৯

মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে সরকারের কঠিন পরীক্ষা

১০

বান্দরবান সদর সেনা জোনের উদ্যোগে বেতছড়া বাজার যুব সংঘকে ক্রীড়া সামগ্রী প্রদান

১১

বান্দরবান প্রেসক্লাব নেতৃবৃন্দের সাথে জেলা জামায়াত আমীরের সৌজন্য সাক্ষাৎ ও বই উপহার

১২

বান্দরবানে স্থায়ী ডুবুরি ইউনিট না থাকায় সাঙ্গু-মাতামুহুরীতে প্রাণহানি: বাড়ছে স্বজনদের দুর্ভোগ

১৩

ফুটপাত দখলমুক্ত ও হকার পুনর্বাসন: প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

১৪

পটিয়ায় ৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করলেন বাদী

১৫

লামায় জাতীয় যুব দিবস উদযাপন: র‍্যালি, ঋণের চেক বিতরণ ও আলোচনা সভা

১৬

আইসিসিবিতে গাড়ির মেলা, এক জায়গায় তুলনা করা যাবে বিভিন্ন মডেল

১৭

ঢাকার শপিংমলের জৌলুস ফিকে, সংকটে খুচরা বাণিজ্য

১৮

বান্দরবানে আন্তাহা পাড়া বৌদ্ধ বিহারের নির্মাণকাজের শুভ উদ্বোধন

১৯

লামায় মিনি-বার ফুটবল টুর্নামেন্টের ফাইনাল অনুষ্ঠিত: চ্যাম্পিয়ন স্বাগতিক লাইনঝিরি একাদশ

২০