
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য হলো: (প্রকৃতি থেকে অনুপ্রেরণায়। জলবায়ুর জন্য। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য) জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির অধীনে এবারের আয়োজক দেশ হলো আজারবাইজান এবং মূল আনুষ্ঠানিকতা আজারবাইজানের বাকুতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বর্তমান সরকারের ৫ বছরে সারাদেশে ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের বিশাল কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আমি মনে করি ৫ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ’ মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর একটি দূরদর্শী এবং সময়োপযোগী পরিবেশগত মহাপরিকল্পনা। জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকি মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে এত বিশাল লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
সরকার পরিবেশ রক্ষার জন্য হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ করছেন আর দুধ-কলাদিয়ে পোষা সাপ (রোহিঙ্গাদের) কারণে কক্সবাজারের পরিবেশ মারাত্মক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। পাহাড়ি বনভূমি উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি স্থাপন, মাটি ক্ষয়, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে। এই মানবিক সংকট মোকাবিলায় আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ মানুষের চাপ স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ওপর এক অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে জাতিগত নিধন ও সহিংসতার শিকার হয়ে ২০১৭ সালে প্রাণভয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় লাখ লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকার সবুজ পাহাড় ও বনভূমিতে তাদের জন্য গড়ে তোলা হয় অস্থায়ী ক্যাম্প। মানবতার খালাসে বাংলাদেশ এই বিপুলসংখ্যক শরণার্থীকে আশ্রয় দিলেও এর একটি বড় ও দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর। বিশাল জনসংখ্যার চাপ, অপরিকল্পিত আবাসন এবং জ্বালানি কাঠের ব্যাপক ব্যবহার এই অঞ্চলটিকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের দ্বারপ্রান্তে এনে দাঁড় করিয়েছে।
রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল ও বনভূমি ধ্বংস করা হয়েছে। এনজিওগুলোর ক্যাম্প স্থাপনের জন্য হাজার হাজার একর সংরক্ষিত বনভূমি উজাড় করে ফেলা হয়েছে। এই নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়েছে।
ক্যাম্প নির্মাণের জন্য পাহাড়ের ঢাল কেটে বসতি তৈরি করা হয়েছে। এতে পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন নষ্ট হয়েছে এবং মাটি আলগা হয়ে বর্ষাকালে নিয়মিত পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটছে।
উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনাঞ্চল ছিল এশিয়ান হাতির অন্যতম প্রধান বিচরণক্ষেত্র। বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় হাতি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচল এবং আবাসস্থল সম্পূর্ণরূপে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
বনভূমি উজাড় ও বৃক্ষনিধন
রোহিঙ্গা সংকটের শুরুর দিকে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে বনভূমির ওপর। ক্যাম্পগুলোতে বসবাসকারী বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতিদিনের রান্নার জ্বালানি কাঠের জোগান দিতে গিয়ে উখিয়া ও টেকনাফের সংরক্ষিত বনভূমির হাজার হাজার একর পাহাড় ন্যাড়া করে ফেলা হয়েছে। নির্বিচারে গাছ কাটার ফলে বন্যপ্রাণীর প্রাকৃতিক আবাসস্থল সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বিশাল এই বনভূমি ধ্বংসের ফলে শুধু বৃক্ষের ক্ষতি হয়নি, বরং পুরো বনজ সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
পাহাড় কাটা ও ভূমিধসের ঝুঁকি
রোহিঙ্গাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করতে পাহাড়ের পর পাহাড় কেটে বসতি ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের মাটি সাধারণত নরম ও বালুময় হয়। গাছপালা কেটে ফেলায় মাটির প্রাকৃতিক বাঁধন আলগা হয়ে যায়। এর ফলে বর্ষাকালে প্রবল বৃষ্টির সময় পাহাড় ধসের ঘটনা নিয়মিত রূপ নিয়েছে। এছাড়া, পাহাড় কাটার ফলে সমতল ও পাহাড়ি অঞ্চলের স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা বর্ষায় বন্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিয়েছে।
মাটি ও বায়ুদূষণ
ক্যাম্প এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে নানাভাবে। পলিথিন ও প্লাস্টিকের যত্রতত্র ব্যবহার, যা সহজে পচে না, তা মাটির উর্বরতা ও গুণাগুণ নষ্ট করছে। অপরিকল্পিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বর্জ্য পদার্থ সরাসরি মিশে যাচ্ছে মাটির গভীরে এবং কাছাকাছি ছড়া বা জলাশয়ে। এছাড়াও, ক্যাম্পগুলোতে সবসময় জেনারেটর চালানো, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা এবং মানুষের অত্যধিক ঘনত্বের কারণে বাতাসে ধূলিকণা ও ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বায়ুদূষণ সৃষ্টি করছে।
ভূগর্ভস্থ পানির তীব্র সংকট
ক্যাম্পের লাখ লাখ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন, পানীয় জল এবং রান্নার জন্য অতিরিক্ত পানির প্রয়োজন হয়। এই বিপুল পানির চাহিদা মেটাতে গিয়ে নির্বিচারে গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়ার কারণে শুষ্ক মৌসুমে স্থানীয় কুয়া ও অগভীর নলকূপগুলো শুকিয়ে যায়, যার ফলে স্থানীয় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা—উভয় জনগোষ্ঠীই তীব্র পানি সংকটে ভোগে।
জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব সংকট
কক্সবাজারের বনাঞ্চল ছিল বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী, বিশেষ করে এশিয়ান হাতির অন্যতম বিচরণক্ষেত্র। বনভূমি উজাড় হওয়ার কারণে হাতি চলাচলের পথ বা করিডোর সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রতিনিয়ত মানুষ ও হাতির মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। এছাড়াও, হরিণ, বানর, বনবিড়াল এবং বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের স্বাভাবিক প্রজনন ও জীবনচক্র ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রাণী আজ বিলুপ্তির পথে।
স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি
পরিবেশের এই বিপর্যয়ের ফলে সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র (ঊপড়ংুংঃবস) ভেঙে পড়েছে। গাছপালা না থাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং উন্মুক্ত পয়ঃনিষ্কাশনের কারণে ক্যাম্পগুলোতে নানা ধরনের সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে, যা পুরো অঞ্চলের জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। এই দূষিত পরিবেশ স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর স্থায়ী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
পরিবেশ পুনরুদ্ধারে চ্যালেঞ্জ ও পদক্ষেপ
রোহিঙ্গাদের কারণে সৃষ্ট পরিবেশের এই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। বন বিভাগ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সহায়তায় পাহাড়ের ঢালগুলোতে বনায়ন কর্মসূচি এবং ক্ষয় রোধে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। রান্নার জন্য এলপিজি গ্যাস সরবরাহ করে বনজ জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে, সম্পূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং টেকসই ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন।
এনজিওগুলো শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব বা টেকসই প্রযুক্তির চেয়ে দ্রুত বসতি স্থাপনের ওপর বেশি জোর দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় কংক্রিট ও বাঁশের অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণে অপরিকল্পিত কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। বিপুল সংখ্যক যানবাহনের চলাচল এবং জেনারেটরের নিরবচ্ছিন্ন ব্যবহার বায়ু ও শব্দদূষণ বাড়িয়ে চলেছে, যা স্থানীয় পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট করছে।
মানবিক কারণে মিয়ানমারের নাগরিকদের আশ্রয় দেওয়া হলেও, এর ফলে বাংলাদেশের পরিবেশ যে ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। পরিবেশের এই সর্বনাশ কেবল নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলের নয়, বরং বৈশ্বিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার পাশাপাশি, বর্তমান ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা ও উন্নয়নের জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে এই অঞ্চলের পরিবেশ অপূরণীয় ক্ষতির শিকার হবে
এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী
মহাসচিব বিশ্ব মানবাধিকার ফাউন্ডেশন,সিনিয়র সহ সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটি,চেয়ারম্যা পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ।
উখিয়া -কক্সবাজার।
মন্তব্য করুন