
চিংনুমং মারমা, রোয়াংছড়ি (বান্দরবান)
১৬ এপ্রিল, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ঘেরা শান্ত জনপদ রোয়াংছড়িতে অত্যন্ত উৎসবমুখর, আনন্দঘন ও মৈত্রীময় পরিবেশে সম্পন্ন হয়েছে মারমা সম্প্রদায়ের প্রধান সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব ‘সাংগ্রাই’। নববর্ষ বরণের এই মহালগ্নে সাংগ্রাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও মূল অনুষঙ্গ ‘জলকেলি’ বা পানি উৎসবের মধ্য দিয়ে বিদায়ী বছরের সমস্ত জরা, গ্লানি ও দুঃখকে ধুয়ে মুছে দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়েছে।
উৎসবের আমেজ ও জলকেলি
বৃহস্পতিবার রোয়াংছড়ি উপজেলা মাঠ প্রাঙ্গণে আয়োজিত এই উৎসবে পাহাড়ি সংস্কৃতির এক অপূর্ব মিলনমেলা পরিলক্ষিত হয়। মারমা তরুণ-তরুণীরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে অপরের ওপর পবিত্র ও শীতল মৈত্রীময় জল বর্ষণ করে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। ঢাক-ঢোল, শঙ্খ আর বাঁশির সুরের মূর্ছনায় পুরো এলাকা এক স্বর্গীয় আমেজে মুখরিত হয়ে ওঠে। স্থানীয় মারমা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মিশেলে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখতে ভিড় জমান দূর-দূরান্ত থেকে আসা শত শত পর্যটক ও স্থানীয় সাধারণ মানুষ।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উৎসবের মহিমা বৃদ্ধি করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সম্মানিত সদস্য জনাব কে.এস.মং। অনুষ্ঠানটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন বান্দরবান জেলা পরিষদের সম্মানিত সদস্য মাধবী মারমা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন:
মেজর সৈয়দ রবিউল ইসলাম, ক্যাম্প কমান্ডার, রোয়াংছড়ি সাব জোন।
তাজমিন আলম তুলি, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, রোয়াংছড়ি।
হুমায়ুন কবির, অফিসার ইনচার্জ (ওসি), রোয়াংছড়ি থানা।
মেহ্লামং মারমা, চেয়ারম্যান, ১নং রোয়াংছড়ি ইউনিয়ন।
উপস্থিত অতিথিবৃন্দ তাদের বক্তব্যে পার্বত্য অঞ্চলের অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং সকল সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্যমান দীর্ঘদিনের সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব জনাব অংশৈচিং মারমা। উৎসবের তাৎপর্য ও গভীর জীবনদর্শন তুলে ধরে তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন:
”আমরা প্রতি বছর নতুনকে বরণ করে নিতে এই আনন্দঘন উৎসবের আয়োজন করি। মৈত্রীময় পানি বর্ষণের মূল উদ্দেশ্য হলো অতীতের সকল দুঃখ-কষ্ট, ব্যর্থতা ও গ্লানিকে ধুয়ে মুছে দিয়ে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। এটি কেবল মারমা সম্প্রদায়ের একক উৎসব নয়; এখানে পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে বিভিন্ন আদিবাসী-গোষ্ঠীর মানুষ সমবেত হয়ে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন। আমাদের এই মিলনমেলাই প্রমাণ করে যে, আমরা সবাই সম্প্রীতির এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ।”
সাংগ্রাই উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো রোয়াংছড়ি উপজেলায় এক অভূতপূর্ব উৎসবের আমেজ বিরাজ করছিল। উৎসবটি কেবল একটি জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সকল ধর্মের ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে এক সর্বজনীন উৎসবে রূপ নেয়। পাহাড়ি ঝরনার শীতল জলের মতো মানুষের হৃদয়েও যেন পবিত্রতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ ছড়িয়ে পড়ে—এই শুভ কামনায় জলকেলির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।
আগামী দিনগুলোতেও যেন পার্বত্য এই জনপদের শান্তি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারা অক্ষুণ্ণ থাকে, সেই প্রার্থনা ও প্রত্যাশা নিয়ে এবারের সাংগ্রাইয়ের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
মন্তব্য করুন