
বর্তমানে দেশের অর্থনীতি একটি অত্যন্ত নাজুক বা খারাপ অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা বর্তমান সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। সরকারের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো, এই অর্থনীতিকে উদ্ধার করা এবং একই সাথে নির্বাচনি ইশতেহারে জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করা। বর্তমানে দেশ একটি ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, যার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ফলে জ্বালানি তেলের অতিরিক্ত দাম একটি বড় সমস্যা। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিসোর্স মোবিলাইজেশন বা সম্পদ আহরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বৈশ্বিক সংকটের এই উত্তাল সময়ে একটি জাতির টিকে থাকা এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রধান হাতিয়ার হলো
জাতীয় ঐকমত্য। বর্তমান বিশ্বের সংকটগুলো আর কোনো নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই; মধ্যপ্রাচ্য সংকট,মহামারি, জলবায়ু পরিবর্তন বা অর্থনৈতিক মন্দার মতো ইস্যুগুলো এখন বৈশ্বিক রূপ নিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভেদ সেই রাষ্ট্রকে আরও দুর্বল করে তোলে।
বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা, ইরান বনাম আমেরিকা ও ইসরাইল যুদ্ধ, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি ও খাদ্য সংকট এবং বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি প্রতিটি দেশকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। এই সংকট মোকাবিলা করা কোনো একক ব্যক্তি বা দলের পক্ষে সম্ভব নয়।
যখন দেশের সকল রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার মানুষ একমত হয়, তখন সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকে। বাইরের চাপ সামলানো তখন সহজ হয়।
বৈশ্বিক মন্দার সময় কৃচ্ছ্রসাধন এবং জাতীয় সম্পদ সঠিক ব্যবহারের জন্য সাধারণ জনগণের সমর্থন প্রয়োজন, যা কেবল ঐকমত্যের মাধ্যমেই সম্ভব।
যে জাতি অভ্যন্তরীণভাবে ঐক্যবদ্ধ, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের দরকষাকষির শক্তি অনেক বেশি থাকে।
যদি কোনো দেশ সংকটের সময় বিভক্ত থাকে, তবে বহিরাগত শক্তি সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারে। বিভেদ থাকলে নীতি নির্ধারণে দেরি হয় এবং জনগণের মধ্যে হতাশা ও অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে, যা শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
জাতীয় ঐকমত্য মানে এই নয় যে সবার চিন্তাধারা এক হতে হবে। এর অর্থ হলো—বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত মতভেদ ভুলে এক টেবিলে বসা। সংলাপ, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধই পারে এই ঐক্য গড়ে তুলতে।
বৈশ্বিক সংকটের ঝোড়ো হাওয়ায় টিকে থাকতে হলে জাতীয় ঐক্যই হলো আমাদের একমাত্র নোঙর। সংকটের এই সময়ে ‘বিভক্তি নয়, ঐক্য’—এই মন্ত্রই হওয়া উচিত একটি আদর্শ রাষ্ট্রের মূলনীতি। কারণ ঐক্যবদ্ধ জাতি পাহাড় সমান বাধাও টপকাতে পারে, কিন্তু বিভক্ত জাতি সামান্য আঘাতেই ধসে পড়ে।
আপনি কি এই প্রবন্ধের কোনো নির্দিষ্ট অংশ (যেমন: অর্থনৈতিক প্রভাব বা রাজনৈতিক ভূমিকা) নিয়ে আরও বিস্তারিত জানতে চান?
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের প্রেক্ষাপটে একটি দেশের জন্য ‘জাতীয় ঐকমত্য’ কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং টিকে থাকার অন্যতম প্রধান শর্ত।
বর্তমান বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু এখন মধ্যপ্রাচ্য। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, ক্ষমতার ভারসাম্য বদল এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর স্বার্থের সংঘাত এই অঞ্চলকে এক আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতার প্রভাব শুধু ওই অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জ্বালানি সংকট, শরণার্থী সমস্যা এবং অর্থনৈতিক মন্দার মাধ্যমে তা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যেকোনো রাষ্ট্র, বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি সুসংহত ‘জাতীয় ঐকমত্য’ অপরিহার্য।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ফলে বিশ্বজুড়ে মেরুকরণ বাড়ছে। একদিকে পশ্চিমা শক্তি, অন্যদিকে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যকার রেষারেষি ক্ষুদ্র ও মাঝারি দেশগুলোকে কঠিন কূটনৈতিক পরীক্ষার মুখে ফেলছে। যখন কোনো দেশ অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত থাকে, তখন বাইরের শক্তিগুলো সেই বিভাজনকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চায়। জাতীয় ঐকমত্য থাকলে বিদেশি হস্তক্ষেপ মোকাবিলা করা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা অনেক সহজ হয়।
আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল। রেমিট্যান্স প্রবাহ এবং জ্বালানি তেলের সরবরাহের জন্য এই অঞ্চলের শান্তি আমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটে যদি জাতীয় পর্যায়ে নীতিগত ঐক্য না থাকে, তবে শ্রমবাজার রক্ষা বা বিকল্প জ্বালানি খোঁজার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো গ্রহণে বিলম্ব হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি দেশের কণ্ঠস্বর তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার পেছনে দেশের জনগণের ঐক্যবদ্ধ সমর্থন থাকে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে কোনো এক পক্ষকে সমর্থন করা বা নিরপেক্ষ থাকা—যে সিদ্ধান্তই নেওয়া হোক না কেন, তা যদি জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে হয়, তবে আন্তর্জাতিক চাপে নতিস্বীকারের ঝুঁকি কমে যায়। এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট অনেক সময় ধর্মীয় বা আদর্শিক উগ্রবাদকে উসকে দেয়। জাতীয় ঐকমত্য না থাকলে দেশের ভেতরে বিভিন্ন গোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন পক্ষ নিয়ে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে। জনগণের মধ্যে সংহতি থাকলে এ ধরনের অপপ্রচার বা উগ্রবাদী আদর্শ শেকড় গজাতে পারে না।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছে। এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে এবং উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে হলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে জাতীয় স্বার্থে এক হওয়া জরুরি। জাতীয় ঐকমত্যই হতে পারে আমাদের প্রধান শক্তি, যা যেকোনো বৈশ্বিক দুর্যোগে দেশকে সঠিক পথ দেখাতে সক্ষম।
২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। তবে ফ্যাসিবাদী শক্তির পতন মানেই ফ্যাসিবাদের সমূলে বিনাশ নয়। ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্র পুনর্গঠন এবং নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে কঠিন লড়াই বর্তমানে চলছে, তা কোনো একক দল বা সরকারের পক্ষে সফল করা অসম্ভব। এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল শক্তির ইস্পাতকঠিন ঐক্য আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ফ্যাসিবাদবিরোধী শক্তির বিভেদই মূলত পরাজিত শক্তিকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ করে দেয়। জুলাই সনদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্রকে এমনভাবে মেরামত করা যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে না পারে, সেজন্য জাতীয় ঐকমত্য অপরিহার্য।
ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ে আদর্শিক বা কৌশলগত মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কোনো অনৈক্য কাম্য নয়। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের রক্তের আকাঙ্ক্ষা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের স্বপ্ন তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন ফ্যাসিবাদবিরোধী সকল রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তি ব্যক্তিগত বা দলীয় সংকীর্ণতা ভুলে ঐক্যবদ্ধ থাকবে। এই ঐক্যই হবে নতুন বাংলাদেশের রক্ষাকবচ।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রাণস্পন্দন হলো তার জাতীয় সংসদ। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে সংসদ অবিসংবাদিত। তবে সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও মতপার্থক্যের কারণে দাবি আদায়ের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে ‘রাজপথ’ বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। অথচ একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্রের জন্য রাজপথের সংঘাত নয়, বরং সংসদের গঠনমূলক আলোচনাই হওয়া উচিত সকল সমস্যার সমাধানের মূল চাবিকাঠি।
গণতন্ত্রে সংসদের গুরুত্ব
সংসদ হলো জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী একটি প্ল্যাটফর্ম। সংসদ সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরতে সেখানে যান । যে কোনো রাষ্ট্রীয় সংকট, আইন প্রণয়ন বা নীতিগত দ্বিমত নিরসনে সংসদীয় বিতর্কই শ্রেষ্ঠ পথ। এখানে যুক্তির মাধ্যমে মতভেদ দূর করার এবং ঐকমত্যে পৌঁছানোর প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ থাকে।
রাজপথ আন্দোলনের ক্ষেত্র হতে পারে, কিন্তু সমাধানের ক্ষেত্র হওয়া উচিত সংসদ। সংসদের কথা যদি রাজপথে আসে, তবে তার ফলাফল জনগণের জন্য সুখকর হয় না । গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি শক্তিশালী করতে হলে শাসক ও বিরোধীউভয় পক্ষকেই সংসদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। রাজপথের সংঘাত পরিহার করে সংসদের টেবিলে আলোচনার মাধ্যমেই একটি উন্নত ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গঠন সম্ভব।
লেখক ঃ সহ সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম, মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন,পরিষদ,উখিয়া
মন্তব্য করুন