
ওসমান এহতেসাম :
চাঁদপুর সদর মডেল থানায় দায়েরকৃত এক ধর্ষণ মামলার আসামি জামিনে মুক্ত হওয়ার পরপরই ফেসবুকে একাধিক ভুয়া আইডি তৈরি করে মামলার ভিকটিম কিশোরীকে হুমকি-ধমকি, ব্ল্যাকমেইল ও সম্মানহানির লক্ষ্যে ব্যাপক অপপ্রচার চালাচ্ছেন বলে বাদীপক্ষের তীব্র অভিযোগ। এ নিয়ে প্রমাণসহ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হলেও প্রায় দুই মাস পেরিয়ে গেলেও পুলিশের তরফ থেকে কোনো ধরনের অগ্রগতি বা তদন্তের খবর নেই, ফলে ভিকটিম কিশোরী ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন।
গত ২৯ জুলাই ২০২৫ রাতে চাঁদপুর সদর থানার সেনগাঁও এলাকায় নাবালিকা রিয়া মনি (১৬) কে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয় যুবক ফাহাদ প্রধানিয়ার (৩২) বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। আসামি কিছুদিন কারাভোগের পর আদালত থেকে জামিন লাভ করেন। বাদীপক্ষের অভিযোগ, জামিন পাওয়ার পর থেকেই আসামি ও তার সহযোগীরা ফেসবুকে একের পর এক ভুয়া প্রোফাইল তৈরি করে বাদীকে নিশানা বানানো শুরু করেন।
ডিজিটাল হয়রানি ও ব্ল্যাকমেইল:
ভিকটিম কিশোরী ও তার পরিবার প্রদত্ত তথ্য ও স্ক্রিনশট অনুযায়ী, ‘ফাতেমা মিম’, ‘GM Zamil Ahmed’, ‘Ahamed Arefin Akash’, ‘GM Sojib’, ‘Sultana Islam’ প্রভৃতি নামে তৈরি ফেক আইডি থেকে একটি সুপরিকল্পিত হয়রানি ক্যাম্পেইন চালানো হচ্ছে।
ভিকটিম কিশোরীর সঙ্গে আসামির আগের পরিচয় থাকাকালীন তার কাছে পাঠানো ব্যক্তিগত ছবিগুলোই এখন ভুয়া আইডি থেকে পোস্ট ও মেসেজের মাধ্যমে প্রকাশ করা হচ্ছে। ছবি সহ পোস্ট করে তাকে “নষ্ট মেয়ে”, “ব্যবসায়িক” ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে।
একাধিক আইডি থেকে বাদীর মেসেঞ্জারে এমন হুমকি এসেছে, “তোর ছবি ভাইরাল কিভাবে করি দেখিছ…”, “জুতার মালা পরিয়ে আসমু”, “১০০ পিছার বাড়ি দিমু”।
মামলা দায়েরের তারিখ নিয়ে বিদ্রূপ করে পোস্ট করা হয়েছে, “যাকে নাকি জুলাই মাসের ২৯ তারিখে ধর্ষণ করছে… এবং তার মনে পরছে সেপ্টেম্বর মাসের ২৮ তারিখে, তাই সে মামলা করে সেপ্টেম্বর মাসের ২৯ তারিখে।”
ভিকটিম কিশোরীর মা-বাবা এবং ভাইয়ের নাম উল্লেখ করে সামাজিক ভাবে হুমকির মাধ্যমেও পীড়ন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
আসামি পক্ষের পাল্টা অভিযোগ ও বাদীপক্ষের জবাব : এসব অভিযোগের প্রতিক্রিয়ায় আসামি ফাহাদ প্রধানিয়া একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন গল্প পেশ করেছেন। তার দাবি, “এই মেয়েকে কখনো তিনি দেখেননি, পরিচয়ও নেই।” তার মতে, বাদীর মায়ের কাছে তার কিছু টাকা পাওনা ছিল, সেই টাকার চাপ তৈরি করতেই “মিথ্যা মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।” তিনি বলেন, মামলা দায়েরের দিন থানায় গিয়েই তিনি প্রথম এই কিশোরীকে দেখেছেন।
ভিকটিম কিশোরী ও তার পরিবার এই দাবিকে সম্পূর্ণ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, আসামির সঙ্গে ভিকটিমের ফেসবুক ও মোবাইলে দীর্ঘদিনের যোগাযোগের রেকর্ড, কথোপকথন এবং সম্পর্ক থাকাকালে আসামিকে পাঠানো বাদীর ছবিই এর জ্বলন্ত প্রমাণ। তারা প্রশ্ন তোলেন, যদি পরিচয়ই না থাকে, তাহাবে আসামি পক্ষের হাতে এই কিশোরীর এতগুলো ব্যক্তিগত ছবি এলো কীভাবে?
জিডি ও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা: অগ্রগতি শূন্য : সাইবার হয়রানি ও ভবিষ্যতের শারীরিক হুমকির আশঙ্কায় ভিকটিম রিয়া মনি গত ৩ ডিসেম্বর, ২০২৫ তারিখে চাঁদপুর সদর মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং-১৯৩) দায়ের করেন। জিডিতে ফেক আইডিগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। কিন্তু জিডি দায়েরের ৬৭ দিন (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ পর্যন্ত) পরও পুলিশের তরফ থেকে কোনো অগ্রগতি বা তদন্ত সংক্রান্ত তথ্য বাদীপক্ষকে দেওয়া হয়নি।
এমনকি, ধর্ষণের মূল মামলাটিরও থানা থেকে আদালতে চালান দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিবেদন (চার্জশিট) এখনো দাখিল করা হয়নি বলে ভিকটিমের পরিবার জানিয়েছে। এই দীর্ঘসূত্রিতা ও নিষ্ক্রিয়তা বাদীপক্ষকে মামলার ন্যায়বিচার নিয়ে গভীর শঙ্কায় ফেলেছে।
আইন কী বলে : নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০: ধর্ষণের মামলায় দণ্ডিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড থেকে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাউকে হয়রানি করা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো বা সম্মানহানিকর কোনো কিছু প্রকাশ করা এই আইনের অধীনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। দণ্ডবিধি: মামলার সাক্ষীকে ভয়ভীতি দেখানো বা মিথ্যা মামলা দায়েরের অভিযোগ আনা দণ্ডবিধির আওতায়ও শাস্তিযোগ্য।
ভিকটিমের আকুতি ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া : ভিকটিম রিয়া মনির পরিবার দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়েছেন। রিয়ার এক আত্মীয় বলেন, “আসামি জামিনে বেরিয়েই যেন একাধিক নতুন অস্ত্র নিয়ে হামলা চালাচ্ছেন। ফেসবুক তার প্রধান হাতিয়ার। আমরা থানায় গিয়েছি, জিডি করেছি, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। আমরা এখন কেমন করে মামলা চালাব, সাক্ষী দেব? সবাই ভয়ে আছে।”
মানবাধিকার কর্মীরা এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে সাইবার হয়রানি একটি নতুন ও ভয়ঙ্কর হাতিয়ার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। পুলিশের তদন্তে গাফিলতি এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেওয়ায় ভুক্তভোগীরা দ্বিগুণ নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনও অমীমাংসিত :
১। আসামি পক্ষের হাতে বাদীর ব্যক্তিগত ছবি কীভাবে এলো, যদি তাদের মধ্যে কখনো পরিচয়ই না থাকে? ২। থানায় জিডি দায়েরের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও পুলিশ কেন কোনো তদন্ত অগ্রগতি বা ব্যবস্থা নেয়নি? ৩। সাক্ষী, ভিকটিম কিশোরী ও তার পরিবারকে এই ডিজিটাল হয়রানি ও হুমকি থেকে কার্যকর সুরক্ষা কে নেবে?
এই ঘটনা শুধু একটি ধর্ষণ মামলার গল্প নয়, বরং তা আমাদের সমাজে ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে ভুক্তভোগীদের মুখোমুখি হওয়া দ্বিতীয় দফা হয়রানি, প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিষ্ক্রিয়তার একটি কঠিন চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। বাদী ও তার পরিবারের পক্ষে ন্যায়বিচার পাওয়া এখন সম্পূর্ণরূপে নির্ভর করছে কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর হস্তক্ষেপের ওপর।
মন্তব্য করুন