
বান্দরবানের লামা উপজেলায় পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দার স্বীকৃতি হিসেবে বোমাং চীফ (রাজার) প্রদত্ত সনদ জালিয়াতির মাধ্যমে ২৫ বছর চাকরি করছিলেন এক প্রধান শিক্ষক। আকতার উদ্দিন নামে ওই শিক্ষক লামা উপজেলার ত্রিডোবা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। অভিযোগ তদন্ত করে অবিলম্বে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলেছে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. আবুল মনসুর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বান্দরবান জেলার ছাত্র প্রতিনিধি মিছবাহ উদ্দীন এ অভিযোগ আনেন।
অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে গঠিত হয়েছে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে জেলা পরিষদের সদস্য সাইফুল ইসলামকে। অন্যান্য দুই সদস্য হলেন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ও লামা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা।
অভিযোগের সূত্রে জানা যায়, আকতার উদ্দিনের বাড়ী নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায়। তার পিতা জনাব আলতাফ উদ্দিন, পিতা- মৃত ওয়াজি উদ্দিন মুন্সী, ১৯৭১ সালে যুদ্ধচলাকালীন সময়ে মৃত্যুবরন করেন। তার পিতার এবং তার নামে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় অতীতে কোনো জায়গা জমি বা কোনো ঘরবাড়ী ছিল না এবং বর্তমানেও নাই। তাছাড়া তারা এই বান্দরবান পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা নয়।
আরও জানা যায়, আকতার উদ্দিন ১৯৯৬-৯৭ সালের দিকে লামা উপজেলায় বেড়াতে আসেন। তখন তিনি ছাত্রলীগের ক্যাডার ছিলেন। সেই সুবাদে আওয়ামীলীগের নেতা কর্মীদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তার বাবার নামে মিল রয়েছে এমন ব্যক্তির জমাবন্দী সংগ্রহ করে অসদুপায় অবলম্বন করে বোমাং রাজার জাল সনদ সংগ্রহ করেন। যা পরবর্তীতে ২০০০ সালে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় আবেদনের সাথে সম্পৃক্ত করে সহকারী শিক্ষক হিসেবে সরকারি চাকুরী হাতিয়ে নেয়। যা সম্পূর্ণ পার্বত্য জেলার নিয়োগ বিধিমালার পরিপন্থী।
অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, চাকুরী হাতিয়ে নেওয়ার পর থেকে তিনি লামা উপজেলার শিক্ষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন সময়ে তৎকালীন সরকারের এম পি/মন্ত্রীর ধমক লাগিয়ে চাঁদাবাজী করতেন। এক পর্যায়ে শিক্ষকগন অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে তাহার বিরুদ্ধে শিক্ষা বিভাগসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে এলাকার শিক্ষকগন বিচার চেয়ে দরখাস্ত করেন। এরই ফলশ্রুতীতে তদন্ত হয়। তদন্তে তিনি দোষী সাব্যস্থ হলে তাকে পাশ্ববর্তী আলীকদম উপজেলায় বদলী করা হয়। যার প্রমানক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে সংরক্ষিত রয়েছে।
এছাড়াও বিগত সরকারের আমলে তৎকালীন পার্বত্য মন্ত্রীর প্যাড, সীল ও স্বাক্ষর জাল করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে লামা পৌরসভার ১ নং ওয়ার্ড চাম্পাতলিতে ঘরসহ জায়গা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে স্থায়ীভাবে পাওয়ার আবেদন করেন। পরবর্তীতে বিষয়টি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় হতে তৎকালীণ পার্বত্য মন্ত্রীকে অবহিত করলে তিনি তা ভুয়া বলে মন্তব্য করেন এবং তিনি বিষয়টি লামা থানা পুলিশকে মুঠোফোনে অবগত করলে লামা থানা পুলিশ আকতার উদ্দিন কে গ্রেপ্তার করে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে আসেন। এছাড়াও তিনি এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত থাকায় তার বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা হলে ইতিপূর্বে দীর্ঘদিন বান্দরবান জেলা কারাগারে ছিলেন।
যেহেতু আকতার উদ্দিনের পিতা জনাব আলতাফ উদ্দিন ১৯৭১ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি কখনো লামায় আসেনও নি। তার পিতার মৃত্যুর অনেক পরে বেড়াতে এসে ১৯৯৬-৯৭ সালে মৃত বাবার নামে জায়গা-জমি না থাকা সত্বেও কিভাবে রাজার সনদ সংগ্রহ করেছেন তাই এ ব্যপারে অধিকতর তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের নিকট আবেদন করাে অভিযোগ জানানো হয়।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত আকতার উদ্দিন বলেন, “আমার সনদ জান না সঠিক তা তদন্ত কমিটি যাচাই বাছাই করে দেখুক। আমার সনদ ভূয়া হলে বোমাং রাজা সেটা লিখে দিক।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগ যেহেতু দিয়েছে তদন্ত কমিটি আমাকে ডাকলে আমি সঠিক কাগজপত্র জমা দিবো। আমি বাংলাদেশের নাগরিক। ভূমিহীন হিসেবে বোমাং রাজা আমাদের সনদ দেওয়ার এখতিয়ার রাখে।
বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক সাইফুল ইসলাম বলেন, তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আমরা এখনো এ বিষয়ে তদন্ত শুরু করিনি। আমরা খুব শীগ্রই তদন্ত কমিটি অভিযুক্ত ব্যাক্তির বোমাং চীফ (রাজার) প্রদত্ত সনদ যাচাই বাছাই করবো। তখন বোমাং চীফ (রাজার) দপ্তরে যোগাযোগ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, অভিযুক্ত ব্যক্তি ২৫ বছর পূর্বে চাকরিতে যোগদান করেছেন। তাই রাজার সনদ জালিয়াতির বিষয়টি যাচাই বাছাই করা খুব জটিল ও স্পর্শকাতর। তদন্ত করে অভিযুক্ত প্রমানিত হলে আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিবো।
উল্লেখ্য, বান্দরবান পার্বত্য জেলায় সরকারি চাকরি পেতে হলে স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে বোমাং চীফের সার্কেলের আওতায় “রাজার সনদ” বাধ্যতামূলক।
মন্তব্য করুন