
তিনি পেশায় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। যার মূল দায়িত্ব কোমলমতি শিশুদের শিক্ষার আলো ছড়ানো। কিন্তু এই শিক্ষকতার আড়ালেই লুকিয়ে আছে অন্য এক ভয়ঙ্কর রূপ। কোনো প্রকার মেডিকেল ডিগ্রি, প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা বা বিএমডিসি’র অনুমোদন ছাড়াই দিব্যি বনে গেছেন ডাক্তার।
বান্দরবানের কুহালং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ আশরাফ সিকদারের বিরুদ্ধে উঠেছে এমনই এক চাঞ্চল্যকর অপচিকিৎসার অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, দিনের বেলা সরকারি বিদ্যালয়ে দায়িত্ব পালন করলেও, বিকেল হতেই তিনি বসেন চিকিৎসকের আসনে। কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষকে দিচ্ছেন ব্যবস্থাপত্র, দেদারসে চালাচ্ছেন অ্যালোপ্যাথিক চিকিৎসা।
এ বিষয়ে স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা জানান: উনি একজন স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু উনি এখানে চেম্বার খুলে সবাইকে প্রয়োজনীয় রোগের ওষুধ দিচ্ছেন। কোনো ডিগ্রি ছাড়া একজন সরকারি শিক্ষক কীভাবে মানুষের চিকিৎসা করেন। এটা তো মানুষের জীবন নিয়ে খেলার সমতুল্য। আমরা ভাবতাম উনি বড় ডাক্তার। এখন শুনছি ওনার কোনো সার্টিফিকেটই নাই। আমরা এ বিষয়ে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে সুস্থ বিচার চাই।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ এম এ হাসান জানান: অভিযুক্ত বিষয়ে যদি যথাযথ প্রমাণ পাওয়া যায় তাহলে প্রশাসনিক ভাবে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত বান্দরবান জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার পরিণয় চাকমা জানান: এ বিষয়ে আমরা এখনো পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য বা প্রমাণ পাইনি। তবে এ বিষয়ে যদি আপনাদের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ পাই তাহলে অবশ্যই অভিযুক্ত ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে আরো বান্দরবান সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডাঃ অতুনু চৌধুরী জানান: চিকিৎসা কেবল একটি পেশা নয়, এটি মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এবং জীবনকে নতুন করে উপহার দেওয়ার এক মহৎ ব্রত। তাই যেকোনো ব্যাক্তির নামের পূর্বে ডাঃ ব্যাবহারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ড ৬ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ আইন মোতাবেক শুধুমাত্র MBBS এবং BDS ডিগ্রি অর্জনকারী ব্যতীত অন্য কেওর নামের পূর্বে ডাঃ ব্যাবহারের এখতিয়ার নেই।
এ বিষয়ে মোটো ফোনে শিক্ষক আশরাফ সিকদার জানান: আমি ডাক্তারি পেশায় নেই। চেম্বারের যাবতীয় কাগজপত্র সবকিছুই আমার স্ত্রীর নামে। এবং চেম্বারের মূল ডাক্তার ও আমার স্ত্রী। যে কেও তো যেকোনো জায়গায় বসতে পারে সুতরাং আমি শুধু এমনিতেই বসি সেখানে। নামের পূর্বে ডাঃ ব্যবহারের জন্য সব ধরণের বৈধ কাগজপত্র আমার আছে এবং সরকারি চাকরির পাশাপাশি ডাক্তারি পেশায় কর্মরত থাকা আর না থাকার বিষয়ে আমি অবগত নই।
সরকারি বিধিমালা অনুযায়ী একজন সরকারি চাকরিজীবী কোনোভাবেই অন্য কোনো লাভজনক পেশা বা ব্যবসায় জড়াতে পারেন না। সেখানে চিকিৎসার মতো সংবেদনশীল পেশায় ডিগ্রি ছাড়া জড়িয়ে পড়া চরম অপরাধ ও নৈতিকতার অবক্ষয় বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এই অপচিকিৎসা বন্ধে এবং অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে দ্রুত বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শিক্ষকতার মতো মহান পেশাকে পুঁজি করে গ্রামীণ জনপদের সরল-সোজা মানুষের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলার এই অপচেষ্টা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একজন সরকারি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের এমন ভুয়া ডাক্তার সেজে চিকিৎসার পেছনে আর কার কার মদদ রয়েছে, তা খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেবে প্রশাসন—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের।