
বান্দরবানের দুর্গম পাহাড়ি উপজেলা থানচির বলীপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শতিশ চন্দ্র গ্রামের একটি হতদরিদ্র জুমচাষি পরিবারে এখন বইছে শোক ও উৎকণ্ঠার ঝড়। প্রতিদিনের অন্নসংস্থানের লড়াই পেরিয়ে পরিবারটি এখন লড়ছে আরও এক নির্মম লড়াই—মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে তাদের একমাত্র ছোট মেয়ে।
মাত্র ১৫ বছর বয়সী অজারুং ত্রিপুরা অবয় বিনোদিনী উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট হওয়ায় পরিবারের নয়নের মণি সে। কিন্তু ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে রাজধানী ঢাকার মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছে এই কিশোরী।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, পাহাড়ে প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হলে স্থানীয়ভাবে তাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় এনে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে হাসপাতালের ষষ্ঠ তলার ১ নম্বর আইসিইউর ১ নম্বর শয্যায় লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন রয়েছে সে। চিকিৎসকরা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও প্রতিদিনই বাড়ছে চিকিৎসার ব্যয়, যা পরিবারটির পক্ষে বহন করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
অজারুংয়ের বাবা পূর্ণচন্দ্র ত্রিপুরা পেশায় একজন অতি হতদরিদ্র জুমচাষি। মেয়ের জীবন বাঁচাতে নিজের সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েও আজ তিনি সম্পূর্ণ সহায়হীন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন,
“মেয়েকে বাঁচাতে যা ছিল সব শেষ হয়ে গেছে। আত্মীয়-স্বজন, জনপ্রতিনিধি ও এলাকার মানুষের সহায়তায় প্রায় চার লাখ টাকার বেশি ঋণ করেছি। এখন আর চিকিৎসার খরচ চালানোর সামর্থ্য নেই। আমি শুধু চাই আমার মেয়েটা বেঁচে থাকুক। সরকারের সহযোগিতা আর সমাজের বিত্তবান মানুষের মানবিক সহায়তা ছাড়া আমাদের আর কোনো ভরসা নেই।”
স্থানীয় বলীপাড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য পিটর ত্রিপুরা জানান, অজারুং অত্যন্ত মেধাবী, শান্ত-স্বভাবের ও ভদ্র একটি মেয়ে। এমন দরিদ্র পরিবারের পক্ষে আইসিইউর ব্যয়বহুল খরচ চালানো সম্পূর্ণ অসম্ভব। তিনি সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের মানবিক সহায়তায় এগিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন।
বলীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিয়াঅং মারমা বলেন, দুর্গম এলাকার এই অসহায় পরিবারটি বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে সবারই এগিয়ে আসা উচিত। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকেও সাধ্যমতো সহযোগিতার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানান তিনি।
সাবেক ইউপি সদস্য লাপ্রাত ত্রিপুরা বলেন, স্থানীয়ভাবে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা হয়েছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি এই চিকিৎসায় পরিবারটি এখন নিঃস্ব। এখন সরকারের পাশাপাশি দেশের বিত্তবান ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।
এ বিষয়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের সুপারভাইজার আমীর হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের মাধ্যমে জেনেছেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবেন।
এদিকে হাসপাতালের আইসিইউতে যখন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে অজারুং, তখন হাসপাতালের করিডোরে নির্ঘুম ও আশঙ্কায় দিন কাটছে তার মা হানাতি ত্রিপুরার। প্রতিটি মুহূর্ত তারা শুধু একটি সুসংবাদের অপেক্ষায়—তাদের মেয়েটি যেন সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসে পাহাড়ের সবুজে ঘেরা নিজেরালয়ে।
একটি সম্ভাবনাময় কিশোরীর জীবন বাঁচাতে এবং এই অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়াতে সরকারের উচ্চপর্যায়, দেশের বিত্তবান ব্যক্তি এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতি জরুরি ভিত্তিতে মানবিক সহায়তার আবেদন জানিয়েছে পরিবারটি। সময়মতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলে হয়তো বেঁচে যেতে পারে মেধাবী শিক্ষার্থী অজারুং ত্রিপুরার প্রাণ।