
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাবে সৃষ্ট জ্বালানি সংকটে মোকাবিলায় দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ৩ দিন অনলাইন ও ৩ দিন অফলাইনে ক্লাসের সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার।সম্প্রতি সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সমন্বয় সভায় এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। পবিত্র মাহে রামাদ্বান ও ঈদুল ফিতরের দীর্ঘ ৩৯ দিনের ছুটি শেষে স্কুল কলেজ খোলার পরপরই এই সিদ্ধান্ত নিতে চায় সরকার। তিন দিন অনলাইনে ক্লাস নিলে ক্লাস বিমুখ হবে শিক্ষার্থীরা, এমনটাই বলছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অনলাইনে ক্লাসের সিদ্ধান্ত দীর্ঘ মেয়াদে হলে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড়ধরণের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অনলাইনে ক্লাসের পরিবর্তে সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাসের সময়সূচীতে পরিবর্তন আনতে পারতো। গ্রীষ্মকালে সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু রাখলে সূর্যের আলোর সঠিক ব্যবহার হবে। এতে শিক্ষার্থীরা ক্লাসমুখীও থাকতো, জ্বালানীর ব্যবহারও কম হতো। ফলে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে রেখেইে জ্বালানী সংকট মোকাবিলা সম্ভব হতো।
তথ্য মতে, পবিত্র মাহে রামাদ্বান ও ঈদুল ফিতর উপলক্ষে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি দেশের স্কুল কলেজে ছুটি শুরু হয়। দীর্ঘ ৩৯ দিন ছুটি কাটিয়ে গত ২৯ মার্চ দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস শুরু হয়। ছুটি থাকায় দীর্ঘ দিন ক্লাস পরীক্ষার বাহিরে ছিল শিক্ষার্থীরা। ফলে ক্লাস শুরু হওয়ার পর আবার অনলাইনের সিদ্ধান্ত আসায় শিক্ষার্থীরা মানসিক চাপে পড়তে পারে।
দেশের জ্বালানী সংকট মোকাবিলায় সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, স্কুল কলেজে প্রাথমিকভাবে সপ্তাহে ছয় দিন ক্লাস চলবে। এর মধ্যে তিন দিন অনলাইনে এবং তিন দিন সরাসরি (অফলাইন) শ্রেণিকক্ষে পাঠদান হবে। শিগগিরই এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা জারি করা হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, জোড়-বিজোড় দিন ভাগ করে অনলাইন ও অফলাইন ক্লাস পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উপস্থিত থেকে ক্লাস নেবেন, তবে নির্ধারিত দিনগুলোতে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে যুক্ত হবে।
২০২০ সালের করোনা মহামারি এবং ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান—এই দুটি বড় ঘটনা বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে যে অপূরণীয় ক্ষতি করেছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
করোনার সময় প্রায় দেড় বছরেরও বেশি সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ ছিল। পরবর্তীতে ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের সময়ও বেশ কিছু মাস অস্থিরতা ও নিরাপত্তার কারণে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ থাকে। ফলে শিক্ষার্থীদের সিলেবাস শেষ না হওয়া এবং দীর্ঘ সময় পড়াশোনা থেকে দূরে থাকার কারণে একটি বড় ‘লার্নিং লস’ বা শিখন ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
মহামারির সময় জেএসসি ও পিইসি পরীক্ষা বাতিল হয় এবং এইচএসসিতে ‘অটোপাস’ দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পরবর্তী পরিস্থিতিতেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা পিছিয়ে যায় বা বাতিল হয়। সঠিক মূল্যায়ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও পরবর্তী উচ্চশিক্ষার ধাপে প্রভাব পড়ছে।
অনিশ্চয়তা, গৃহবন্দি দশা এবং সামাজিক অস্থিরতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে একঘেয়েমি, বিষণ্ণতা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করেছে। এই মানসিক ধকল কাটিয়ে পড়াশোনায় পূর্ণ মনোযোগ ফেরানো অনেক শিক্ষার্থীর জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক সংকটের কারণে অনেক দরিদ্র শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে পড়াশোনা থেকে দূরে সরে গেছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বাল্যবিবাহ এবং শিশুশ্রম বৃদ্ধি পাওয়ায় বড় একটি অংশ শিক্ষাব্যবস্থা থেকে ছিটকে পড়েছে।
অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও ডিজিটাল ডিভাইসের অভাব ও ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে সাধারণ ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা শহরের শিক্ষার্থীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়েছে।
অনলাইন ক্লাসের নেতিবাচক প্রভাব এবং এর ফলে শিক্ষাব্যবস্থা বা একটি জাতির সম্ভাব্য ক্ষতির দিকগুলো নিয়ে নিচে একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ দেওয়া হলো:
আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষে অনলাইন ক্লাস বর্তমানে শিক্ষার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে এর অপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহার একটি জাতির মেরুদণ্ড তথা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিতে পারে।
অনলাইন ক্লাসে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যে সরাসরি সংযোগের অভাব থাকে। ল্যাপটপ বা মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখা অধিকাংশ শিক্ষার্থীর জন্যই কঠিন। এর ফলে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হয় এবং শিক্ষার্থীরা ভাসা-ভাসা জ্ঞান নিয়ে বেড়ে ওঠে।
বিদ্যালয় কেবল পাঠ্যবই পড়ার জায়গা নয়, এটি সামাজিকীকরণের কেন্দ্র। অনলাইনে ক্লাসের কারণে শিক্ষার্থীরা সমবয়সীদের সাথে মেশার এবং দলগতভাবে কাজ করার সুযোগ হারায়। এতে তাদের মধ্যে একাকীত্ব, বিষণ্ণতা এবং অসামাজিক আচরণ বৃদ্ধি পায়, যা ভবিষ্যতে একটি বিচ্ছিন্ন সমাজ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশের মতো দেশে সবার কাছে উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং স্মার্ট ডিভাইস পৌঁছায়নি। শহরের সচ্ছল শিক্ষার্থীরা সুযোগ পেলেও গ্রাম বা সুবিধাবঞ্চিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে। এই ডিজিটাল বিভাজন জাতির মধ্যে এক বিশাল বৈষম্য তৈরি করছে।
অনলাইন ক্লাসের প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের হাতে মোবাইল বা ট্যাব তুলে দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা পড়ার বদলে গেম, সোশ্যাল মিডিয়া বা অনাকাঙ্ক্ষিত কনটেন্টে আসক্ত হয়ে পড়ছে। এই আসক্তি তাদের সৃজনশীলতা ও শারীরিক স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অনলাইন পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের সুযোগ অনেক বেশি থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মেধার চেয়ে ‘শর্টকাট’ উপায়ে সফল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। নৈতিকতা ও সততার অভাব একটি জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের জন্য অশনি সংকেত।
অনলাইন ক্লাস জরুরি প্রয়োজনে বা বিকল্প হিসেবে কার্যকর হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই সরাসরি শিক্ষার বিকল্প নয়। একটি মেধাবী ও বলিষ্ঠ জাতি গঠনে শ্রেণিকক্ষের প্রাণবন্ত পরিবেশ ও শিক্ষকের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনার কোনো বিকল্প নেই।
বর্তমান বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি আমাদের জীবনকে সহজ করলেও এর অপব্যবহার তরুণ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ সংকট তৈরি করেছে। করোনা কালীন সময়ের পর হতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মোবাইল ফোনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি এবং মরণব্যাধি মাদকাসক্তি আজ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই দ্বৈত আসক্তি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শারীরিক, মানসিক এবং মেধা বিকাশের পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আধুনিক যুগে স্মার্টফোন শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য এটি এখন নেশায় পরিণত হয়েছে। অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার চেয়ে মোবাইল গেম (যেমন: ফ্রি-ফায়ার, পাবজি), সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক, টিকটক) এবং ইউটিউবে বেশি সময় ব্যয় করছে
মোবাইল আসক্তির পাশাপাশি মাদকাসক্তি শিক্ষার্থীদের জীবনকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। কৌতূহল, ভুল সঙ্গত বা একাকীত্ব দূর করতে গিয়ে অনেকে মাদকের মরণ নেশায় জড়িয়ে পড়ছে । মাদকাসক্তির ফলে মেধা ও বিবেক লোপ পায়, যা একজন শিক্ষার্থীকে অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত করে ।
শিক্ষার্থীরাই দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের এই ভয়াবহ আসক্তি থেকে মুক্ত করতে না পারলে জাতি হিসেবে আমরা মেধাশূন্য হয়ে পড়ব। তাই সময় থাকতেই অভিভাবক ও প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে প্রযুক্তির আশীর্বাদ অভিশাপে পরিণত না হয় এবং তরুণ সমাজ মাদকের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফিরে আসে।
পরিশেষে আমার নিজ এলাকার শিক্ষার যে করুন ঞাল তা উল্ল্যেখ না করে পারছি না।
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা এখন প্রায় ১৬ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ একটি মানবিক দৃষ্টান্ত হলেও, এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ এলাকার ছাত্রছাত্রীদের উপর। তাদের শিক্ষা জীবনে এক অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছে।
রোহিঙ্গা আগমনের শুরুর দিকে অনেক স্থানীয় স্কুল ও কলেজকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র বা ত্রাণ বিতরণের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল। এর ফলে ওই সময়ের কয়েক মাস স্থানীয় শিক্ষার্থীদের পাঠদান পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এছাড়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অতিরিক্ত মানুষের চাপে আসবাবপত্র ও অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
রোহিঙ্গা শিবিরে বিপুল সংখ্যক এনজিও এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কার্যক্রম শুরু হওয়ায় স্থানীয় অনেক শিক্ষিত তরুণ-তরুণী উচ্চ বেতনে এনজিওতে চাকরিতে যোগ দেয়। এতে স্থানীয় স্কুলগুলোতে শিক্ষকের সংকট তৈরি হয়। অন্যদিকে, ক্যাম্পে অদক্ষ শ্রমিকের চাহিদা বাড়ায় অনেক দরিদ্র পরিবারের শিশু পড়ালেখা ছেড়ে উপার্জনের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে, যা স্থানীয় পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর কারণে উখিয়া ও টেকনাফের রাস্তাঘাটে সব সময় ত্রাণবাহী ভারী যানবাহন ও এনজিওর গাড়ির জটলা লেগে থাকে। এতে করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্কুল-কলেজে যাতায়াত অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ও সময়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। যানজটের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সময়মতো পরীক্ষায় অংশ নিতেও সমস্যায় পড়ে।
ক্যাম্প এলাকায় মাদক ও বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে স্থানীয় অভিভাবকরা সন্তানদের, বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছেন। সামাজিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক ছাত্রছাত্রীর শিক্ষা জীবন অকালেই থমকে যাচ্ছে।
রোহিঙ্গাদের মানবিক আশ্রয় দেওয়া বাংলাদেশের জন্য গৌরবের হলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ত্যাগও অপরিসীম। স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবন রক্ষা করতে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। পর্যাপ্ত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা না করলে একটি গোটা প্রজন্মের মেধা ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
লেখক ঃ সহ সভাপতি বাংলাদেশ ইউনিয়ন পরিষদ ফোরাম, মহাসচিব রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম জাতীয় কমিটি ও চেয়ারম্যান পালংখালী ইউনিয়ন,পরিষদ,উখিয়া